পাশা খেলে বাঘ্ছাল খোয়ালেন শিব

থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় জীবনটাকে বইতে বইতে বেজায় ক্লান্তি অনুভব করলেন ভোলানাথ| 'নাহ‚ বড় একঘেয়ে জীবন হয়ে গেছে| সেই রোজ শ্মশানে যাওয়া‚ ছাই মাখা‚ ধ্যান করা আর মাঝে মাঝে কলকেতে টান দেওয়া| তার ওপর তো পার্বতীর নিত্য নৈমিত্তিক এটা নেই ‚ ওটা চাই আব্দার মেটাতে মেটাতে জেরবার হয়ে গেলাম| কোথাও যে ঘুরতে যাব‚ তাতেও তো সেই ট্যাঁকের একগাদা কড়ি খসবে| তারপর লোটা কম্বল সমেত সবকটাকে বগলদাবা করে নিয়ে চল| নাহ আর ভালো লাগছে না| একটু বদল দরকার| তার ওপর সকালে এক প্রস্থ মাথা গরম না করলেই হত| যাই হোক না কেন সংসারটা মাথায় করেই রেখেছে|'

পার্বতীরও মনোভাব একই| ' সেই রাঁধার পর খাওয়া আর খাওয়ার পর রাঁধা| না কোথাও যাই না কিছু| নিজের এত গুন সব জলে যাচ্ছে| ছাতার সংসারে আর মন বসে না| আর ওদিকে লোকটাকে দেখ সারাদিন ছাই পাঁশ মেখে শ্মশানে-মশানে বসে আছে‚ কোন চিন্তা ভাবনা আছে| যেন আমার একার দায় সব| যেদিকে চোখ যায় সেদিকে যে চলে যাব তাও পারি না| সাধে কি আর মহামায়া আমার নাম| মায়ায় সবাইকে যেমন বেঁধে রেখেছি তেমন নিজেকেও তো মায়ামুক্ত করতে পারি না| কি যে শাঁখের করাত অবস্থা‚ বেশ নিজে টের পাচ্ছি এখন|'


দুজনেই দুদিকে মুখ করে বসে ভাবছেন এইসব সাত পাঁচ| হঠাৎ ভোলানাথ বললে‚ 'প্রিয়ে বহুদিন আমরা পাশা খেলি না‚ মনে হয় এবার ভুলেও যাব| পাশা খেললে কেমন হয়?'

পার্বতী ভাবলেন‚ মন্দ বলেনি কথাটা| সেই তো পিতৃগৃহে থাকার সময় বাবা কত যত্ন করে শিক্ষক রেখে পাশা খেলা শিখিয়েছিলেন| সেইসময় পাশাখেলা শেখাটা একটা আবশ্যিক গুণ হিসাবেই গণ্য হত| তা পোড়া সংসারের জ্বালায় সেসব গুণ গেছে না আছে একবার বরং ঝালিয়ে নেওয়া যাক| তিনি সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন|

অতঃপর দুজনেই পাশার দান বিছিয়ে বসলেন| শিব তো চিরকেলে ভোলামহেশ্বর‚ খেলাটাও মন দিয়ে শিখে উঠতে পারেন নি| আসলে সব ঐ গাঁজার জন্য| খেলতে বসলেই কেমন যেন একটা কিছুর অভাববোধ করছেন| মন আর বসে না| পার্বতীর সাথে কিছুতেই পেরে ওঠেন না| একের পর এক দান হেরে যান| আর একের পর এক বাজি জিতে যান পার্বতী| অনেকদিন পর মনে বেশ উত্তেজনা অনুভব করেন| বেশ একটা গর্বও বোধ হয় নিজের কৃতিত্বে| এদিকে হারতে হারতে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন মহেশ্বর| এমনকি নিজের বাঘছালটিও হেরে বসেন| লজ্জানিবারণের জন্য পার্বতীর একটি বস্ত্র পড়ে মনের দুঃখে গঙ্গাতীরে চলে যান| এদিকে পার্বতী জয়ের খুশিতে খেয়ালও করলেন না ভোলানাথ কোথায় গেলেন|

এদিকে গঙ্গারে তীরেই কার্তিকের সাথে দেখা হয় শিবের| বাবাকে এমন ভঙ্গুর অবস্থায় কোনদিন দেখেনি সে| তার ওপর বাবাকে সে ভীষনই ভালোবাসে| বেশ কষ্ট হয় তার| বাবার কাছে সে জানতে চায়‚' পিতা এমন মুখ শুকনো করে ঘুরছেন কেন? কি হয়েছে আমায় খুলে বলুন| আমি সাধ্যমত প্রতিকার করব|'

ভোলানাথের মনে তখন পার্বতীর প্রতি একরাশ অভিমান| কোন স্ত্রী পারে স্বামীকে এইভাবে ভিখারী করে দিতে? পার্বতীর কি একটিবারের জন্যও তার কথা মনে পড়ছে না? সে কোথায় গেল‚ কি খেল একবারও কি ভেবেছে? মনের এই অবস্থায় কার্তিকের মধুর বাণীতে যেন শিশুর মত ভোলানাথের অভিমান উথলে উঠল| সব জানালেন প্রিয় পুত্রকে|


কার্তিকে শুনে বললেন‚ ' বেশ পিতা আপনার যা কিছু মাতা দ্যুতক্রীড়ায় জয় করেছেন‚ সবই আমি মাতাকে পরাস্ত করে আপনাকে এনে দিচ্ছি| আপনি দুঃখ করবেন না'| বলে কার্তিক তৎক্ষণাৎ কৈলাসে উপস্থিত হয়ে মাতা পার্বতীকে পাশাখেলায় আমন্ত্রণ জানালেন|

পার্বতী সদ্য সদ্য স্বামীকে পরাজিত করেছেন| পুত্রকেও অনায়াসে পরাস্ত করবেন| অতএব বিন্দুমাত্র চিন্তা না করেই পাশাখেলায় রাজী হয়ে গেলেন| কিন্তু এবার আর দান পার্বতীর পক্ষে পড়ল না| পরপর প্রত্যেকটা দানে কার্তিক জিততে লাগলেন এবং পিতার হৃত সামগ্রী তো উদ্ধার করলেনই সেই সাথে মাতার সমস্ত জিনিস বাজীতে জিতে গেলেন| অতঃপর সবকিছু নিয়ে তিনি গঙ্গাতটে পিতার সাথে সাক্ষ্যাৎ করে সব সামগ্রী পিতাকে ফিরিয়ে দিলেন| ভোলানাথ যারপরনাই খুশি হলেন| কার ছেলে দেখতে হবে তো ভেবেই বুকটা সাতহাত উঁচু হয়ে গেল|

গিরিকন্যা পড়লেন মহা ফাঁপড়ে| এক তো বরটা বেপাত্তা‚ তার ওপর যাও বা কিছু বরটাকে হারিয়ে জিতেছিল সেগুলো এমনকি নিজের জিনিসগুলো চলে গেল| কার্তিকটা বরাবরই একচোখো| থাকত তার গণেশ‚ বুঝত মায়ের দুঃখ| একটু ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কেঁদে নিলেন| কোথায় ছিল গণশাটা কে জানে? ঠিক টের পেয়েছে| মায়ের চোখের জল একদম সে সহ্য করতে পারে না| ঠিক খুঁজে পেতে হরিদ্বারে গিয়ে বাবাকে পাকড়াও করল সে| লোকটার সেকি ফুর্তি তখন| কিন্তু গণেশও পার্বতীর সন্তান| মায়ের কাছের থেকে কিছু কম শিক্ষা তো পায়নি সে| তবে হ্যাঁ বুদ্ধিটা মাঝে মাঝে ঠিকঠাক কাজ করে না এই যা| না হলে বাবাকে পাশাখেলায় হারিয়ে দিয়ে মাকে সংবাদ দিতে সে তড়িঘড়ি পৌঁছে গেল‚ কিন্তু বাবাকে সাথে করে নিয়ে যাবার কথা তার মনেও এল না| ভাগ্যিস মা বলল‚' পিতাকে নিয়ে এস হেথায় পুত্র'|


গণেশ আবার গিয়ে উপস্থিত হল গঙ্গাতটে| ভোলানাথ তখন বিষ্ণু‚ কার্তিক আর এক গণের সাথে ভ্রমণ করছিলেন| গণেশ গিয়ে জানালো‚ ' পিতা‚ মাতা আপনাকে বহুক্ষণ না দেখতে পেয়ে ভীষন চিন্তিত| অনুগ্রহ করে ফিরে গিয়ে তাঁর চিন্তা দুর করুন|'|

আশুতোষ এমনিতেই অল্পে তুষ্ট হন‚ কিন্তু সেদিন আর কিছুতেই পার্বতীর ওপর থেকে অভিমান যাচ্ছিল না| একে নিজে তো হারাল তাঁকে‚ তার ওপর আবার নিজের প্রিয় পুত্রকে পাঠাল তাকে হারিয়ে দেবার জন্য| এ এক চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়| কিছুতেই তিনি ফিরবেন না কৈলাসে| থাক সেখানে অপর্ণা একা একা|

এদিকে শিবের সেই ভক্ত গণ শিবের মনোভাব বুঝে মার্জারের রূপধারণ করে এমন তাড়া করল গণেশের বাহন মুষিককে‚ যে সে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাঁচল| গণেশের মুষিক ছাড়া অবস্থা শোচনীয়| একে তো অত ভারী শরীর তায় হেলেদুলে চলতে সময় কম লাগবে নাকি| তায় খালি খালি কিছুক্ষণ অন্তর খিদে পায়| কিন্তু গণেশ অত বোকাও নয়| যাক গে যাক বাবাকে তো আগে রাজী করাই তারপর তোর ব্যবস্থা করছি মনে মনেই বলে গণেশ|

গণেশ অনুনয়-বিনয় করতে লাগল পিতাকে ফিরে যাবার জন্য| কিন্তু শিবের রাগ আর পরে না| তখন তিনি এক বুদ্ধি আঁটলেন| বিষ্ণুকে কানে কানে বললেন‚ 'হে মিত্র‚ আমি পার্বতীকে পাশাখেলায় হারাতে তো পারব না‚ কিন্তু আপনি যদি আমার পাশা হন‚ তবে আমি যেমনটা চাইব তেমনটাই দান হিসাবে পড়বেন| আপনি আপনার মিত্রের জন্য এই কৃপাটুকু করুন|'

অতঃপর বিষ্ণু পাশারূপ ধারণ করলেন|


ভোলানাথ তখন গণেশকে সম্বোধন করে বললে‚' হে পুত্র গণেশ‚ তোমার মাতা যদি পুনরায় আমার সাথে পাশাখেলায় রাজী হন এবং আমার নতুন পাশাদ্বারা খেলতে রাজি হন‚ তবেই আমি ফিরে যাব কৈলাসে|'

গণেশ সানন্দে রাজি হয়ে গেল| যাক বাবা‚ রাগ তবে কিছুটা হলেও পরেছে| অতঃপর শিব‚ কার্তিক ‚| ভক্ত গণ আর গণেশকে নিয়ে আর পাশারুপী নারায়নকে নিয়ে রওনা হলেন কৈলাসে|

কৈলাসে গিয়ে গণেশ ব্যক্ত করলে শিবের বক্তব্য| পার্বতী হেসে ফেললেন| বললেন‚' হে প্রভু‚ আপনি তো পাশাখেলায় পুর্বেই হেরে গেছেন| এমন কি বস্তু আছে যা আপনি বাজী ধরতে পারেন? সবই তো এখন আমার কাছে|'

শিব কোন জবাব দিলেন না| নারদ ঘটনাক্রমে সেইসময় সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে পুরো পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন| শিবের এই দৈন্য দশা তাঁকে অত্যন্ত পীড়িত করল| তিনি আপন বীণাসহ যা কিছু নিজের কাছে ছিল সবই শিবকে অর্পণ করলেন| খেলা শুরু হল| কিন্তু প্রথম দান থেকেই পাশা কিছুতেই দান অনুযায়ী পরল না| শিবের ইচ্ছানুযায়ী পরতে শুরু করল| পার্বতী চিন্তিত হয়ে উঠলেন‚ গণেশ তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুঝতে পারল‚ এ এক বড় চক্রান্ত| নিশ্চয় ঐ পাশা মন্ত্রঃপুত| এবার সে মাতাকে সতর্ক করতেই পার্বতী বিশেষ ক্ষমতাবলে জানতে পারল‚ ঐ পাশা আসলে শ্রী বিষ্ণু| তিনি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে উঠলেন‚ এই কপটতা‚ এইঅ শঠতায়| শ্রী বিষ্ণু স্বরূপ ধারণ করে পার্বতীকে বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগলেন| শিব‚ কার্তিক‚ শিবের সেই গণ সবাই মিলে বোঝাবার ব্যর্থ প্রায়াস করে ক্ষান্ত হলেন| পার্বতীর রাগ পড়ে না‚ তিনি অভিশাপ দিলেন‚ ' হে ভোলানাথ আপনি আমার সাথে যে কপটতা করেছেন তার কোন ক্ষমা হয় না| আপনাকে যারা সঙ্গত করেছেন তারাও ক্ষমার অযোগ্য| তাই আমি আপনাকে অভিশাপ দিচ্ছি‚ যে গঙ্গাতীরে আপনি ভ্রমন করছিলেন সেই গঙ্গার ভয়াবহা ভার আপনাকে মস্তকে ধারণ করতে হবে‚ আর শ্রী হরি আপনি যেমন আমার সাথে ছল করেছেন তার শাস্তিস্বরূপ আপনাকে মর্তে মানবঊপে জন্ম নিতে হবে| আর গণ তুমি ভোলানাথকে অন্যায়ভাবে সমর্থন করেছ‚ তাই তুমি শ্রীহরির শত্রুরূপে ভুমিতে জন্মাবে| নারদ‚ ঋষিবার আপনিও অজ্ঞাত ছিলেন না শ্রী হরি আর শিবের এই চক্রান্ত থেকে‚তাও আপনি যেভাবে ওদের সহায়তা করেছেন তা নিন্দনীয়| আমি আপনাকে অভিশাপ দিলাম‚ আপনার এই কর্মের জন্য আপনি কোনদিন কোথাও বেশিক্ষণ তিষ্ঠোতে পারবেন না| আর কার্তিক ‚ যদিও তুমি আমার পুত্র তথাপি পিতার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবার জন্য তুমি জীবনে কোনদিন বিবাহ করতে পারবে না| এই বাল্যরূপেই তুমি থেকে যাবে|'

এবার বুঝেছেন তো পাশাখেলা কত খারাপ| না থাকত পাশা না এতকিছু হত| না কি ভাবছেন সবই ভবিতব্য| রাম না হলে রাবণ মরত না| সবই কান টানলে মাথা আসার ঘটনা|

যাই হোক আমার কথাটি ফুরোল|

0/Post a Comment/Comments

Stay Connected

Business