ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত কর " স্তন কর "

 ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত কর " স্তন কর "

Image Credit :Mulakaram Flim

সম্পাদক ডেস্ক : ১৮০০ দশকের গোড়ার দিকে  এই ভারতবর্ষে বর্ণবিদ্বেষের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হলো স্তন কর। উপজাতি বা নিম্নজাদিতের সমাজে তাদের স্থান কি তা বোঝানোর জন্য যুগে যুগে শাসকেরা বিভিন্ন প্রথা প্রচলন করে এসেছেন।  এর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য কুৎসিত আইন হলো স্তন কর।  দক্ষিণ ভারতের ইংরেজ শাসিত পূর্বকালীন ত্রিবাঙ্কুরের    (৫৫০ princely state রাজা এই কর আরোপিত করেছিলেন।  এই আইনে নিম্ন বর্ণের মহিলাদের স্তন এ কোনো আবরণ রাখা যাবে না অর্থাৎ স্তন দৃশ্যমান করে রাখতে হবে।  যদি কোনো নিম্নবর্গ মহিলা স্তন আবরণ করে বা ঢেকে রাখে তাহলে তার ওপর প্রচুর কর আরোপ করা হতো ।  গরিব উপজাতির পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব ছিল না তাই দিনের পর দিন তারা এই নিয়ম মেনে যে বাধ্য থাকতো , তাদের কথা শোনার কেউ ছিল না। রাজকীয় আধিকারিকরা ঘরে ঘরে ভ্ৰমণ করে এই কর আদায় করত। করের  পরিমান স্তনের  আকারের ওপর নির্ভর করত।  কর আদায়কারী আধিকারিক হাত দিয়ে স্পর্শ করে স্তনের আকারের নিরক্ষন করতেন এবং স্তনের আকারের ওপর নির্ভর করে কর গণনা করতেন।  এই কর আদায়ের একমাত্র লক্ষ ছিল নিম্নবিত্তদের অপমান করা কারণ উচ্চবর্গীয় মহিলাদের ওপর এই কর লঘু ছিল না , তাদের পোশাক পরিধানের ওপর কোনও বিধিনিষেধ ছিল না।  এই সময় কোনও জাতির সামাজিক অবস্থান নির্ণয় হতো তার বর্ণের ভিত্তিতে এবং এই কারণে তাদের পোশাক পরিধানের মধ্যদিয়ে সমাজে তাদের অবস্থান জানানোর ব্যবস্থা করেন উচ্চ বর্ণের মানুষরা।  , সহযোগী লিঙ্গ বাস্তববিদ্যা ও দলিত গবেষণার অধ্যাপক  ডাঃ শিবা কে এম, শ্রী শঙ্করাচার্য সংস্কৃত মহাবিদ্যালয় এর একজন গবেষক হিসাবে বলেন "ব্রেস্ট ট্যাক্সের উদ্দেশ্য ছিল বর্ণের কাঠামোকে বজায় রাখা ছাড়া আর কিছুই নয়।  পোশাক কে সম্পদ ও ঐশর্যের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা হত এবং গরিব ও নিম্নবর্গের লোকেরা এটার অধিকারী ছিলেন না। তার বই Native Life in Travancore গ্রন্থে লেখক Samuel Mateer কেবলমাত্র নিম্নবর্গীয়র উপর আরোপিত প্রায় ১১০ টি অতিরিক্ত করের  একটি তালিকা প্রকাশ করেছিলেন।  এটি এমন একটি ব্যবস্থা ছিল যা নিশ্চিত করেছিল যে নিম্ন বর্গগুলি সর্বদা মইয়ের সর্বনিম্নে থাকে আর উচ্চ বর্গীরা সমৃদ্ধ হয়।  তিনি বলেন স্তন কর এই করগুলির মধ্যে সব থেকে খারাপ।  

নিম্নবিত্তদের বিদ্রোহ 


এই অন্যায়ের বিরুধ্যে ক্রমাগত অসন্তুষ্টি জগতে থাকে মানুষের মধ্যে এবং ১৮৯৯ সালে চরমপর্যায়ে ওঠে যখন দুই নিম্ন বর্গের মহিলা ওপরের দেহের পোশাক পড়া অবস্থায় কর্মকর্তাদের নজরে আসে এবং এই আইন ভাঙার জন্য প্রকাশ্যে ওই দুই মহিলাকে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। 

এই নিষ্ঠূর  অন্যায়ের বিরুধ্যে এবার রুখে দাঁড়ালেন নানগেলি নাম এক সাহসী মহিলা।  তিনি চিরতরে এই নিষ্ঠূর   প্রথা উঠিয়ে দেওয়ার জন্য পান করলেন।  এই মহিলা কেরালার Ezhava নামক নিম্নজাতির ছিলেন। এই উপজাতির মহিলারা এই জঘন্য করে অন্যতম শিকার ছিলেন।  কথিত আছে নানগেলির বাড়িতে যখন কর আদায়কারী কর্মকর্তা যায় ,তখন টাকা রাখার পরিবর্তে একটি থালায় তার স্তন কেটে রাখেন এবং কর আদায়কারীর হাতে সেই থালা দেন।  অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয় এবং তার স্বামীও তার চিতায় লাফিয়ে নিজেকে শেষ করে দেয়।  দাবানলের মতো এই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পরে এবং ট্রাভাঙ্কোর এর রাজার বিরুধ্যে স্থানীয়রা ক্ষোভে ফেটে পরে। প্রতিবাদের আগুন এমনই জ্বলেছিল যে  রাজা মৃত্যভয়ে মাদ্রাজের  গভর্নরের চাপে ১৯২৪ সালে সমস্ত মহিলাদের উপরের কাপড় পড়ার অধিকার দিতে বাধ্য হন।  

নানগেলি যে স্থানে তার স্তন কেটেছিলেন তাকে এখন মুলাচিপারাম্বু বলা হয় যার অর্থ "মহিলার স্তনের দেশ  "

নানগেলির উত্তরাধিকারি 

নানগেলির গল্প এখনো বয়ে বাড়ায় এখানকার স্থানীয় শিল্পীরা। মুরালি নামের এক লোক যখন এক লোকাল ব্যাংকের ম্যাগাজিন এ নানগেলি সমন্ধে একটি ছোট গল্প পড়েন তখন সে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সেই গ্রামে যান অর্থাৎ "মহিলার স্তনের দেশ" তিনি সিদ্ধান্ত নেন তার চিত্রের মধ্যদিয়ে নানগেলিকে জীবন্ত করে রাখবেন আজীবন।  এটি মধ্যে তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ১৫ টি চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছেন।  তিনি গর্বের সাথে বলেন "আমি যদি জনগণকে তার কর্মের কথা বোঝাতে পারি তাহলে ইতিহাসের অংশে তার কথা অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার নজর দিতে পারবে " 

0/Post a Comment/Comments

Stay Connected

Business